বাংলা
গত ২৪ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনের এক ইফতার মাহফিলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে ভাষণ দিয়েছেন, তা নিয়ে এখন দেশের রাজনৈতিক সচেতন মহলে আলোচনার ঝড় বইছে।
ওই ভাষণে তারেক রহমান বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন, তাকে বিশিষ্টজনরা প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন রাজনৈতিক নেতার ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারটির দুঃশাসন লুটপাটে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করে তুলতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তারেক রহমানের ২৪ জুলাইর প্রস্তাবনায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ওই ইফতার মাহফিলে শত শত প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতিতে তারেক রহমান তার প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। উপস্থিত নেতাকর্মীরা তুমুল করতালি ও হর্ষোধ্বনির মাধ্যমে তার পরিকল্পনাকে স্বাগত ও সমর্থন জানায়। ওই অনুষ্ঠানে প্রবাসী বিএনপি নেতাকর্মী ছাড়াও বহুসংখ্যক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমান তার ভাষণে কৃষি, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে কীভাবে বদলে দেয়া সম্ভব তাই তুলে ধরেছেন। তার ওই ভাষণকে সংবাদ মাধ্যমগুলো একটি গবেষণাধর্মী উপস্থাপনা হিসেবে মন্তব্য করেছে।
তারেক রহমানের ওই ভাষণকে পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টিকে তিনি তার রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনায় সর্বোচ্চে স্থান দিয়েছেন। চলমান বিশ্ব প্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া যায়, তার বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনাই প্রতিফলিত হয়েছে তার ওই ভাষণে।
লক্ষ্য করার বিষয় হলো- তিনি তার পরিকল্পনায় কৃষিকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী করতে হলে এ খাতকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্পজাত পণ্যের রফতানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ অর্জিত হলেও জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এখনো কৃষির অবদানই বেশি। তাছাড়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কৃষির সঙ্গেই জড়িত। তাই কৃষিকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে তারেক রহমান তার ধী-শক্তিরই প্রমাণ রেখেছেন।
তিনি বলেছেন, কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকি আরো বাড়িয়ে এ খাতকে রফতানি কেন্দ্রিক শিল্পে রূপান্তর করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, ব্রিটেনের সেইন্সবারি, আজদা টেসকোসহ বড় সুপারস্টোরগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অন্যান্য দেশ যদি ব্রিটেনের চাহিদামতো পণ্য জোগান দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের কৃষি খাতকে শিল্পে রূপ দিয়ে এমন একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করতে হবে, যেখান থেকে দেশের কৃষক ও পোল্ট্রি মালিকদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের ব্যবসায়ীদের যোগসূত্র স্থাপন করা সম্ভব হবে। কৃষিখাতে আরো অধিক পরিমাণে ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদিত পণ্য ব্রিটেনসহ বিশ্ববাজারে রফতানি করতে হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রফতানি বাজার বর্তমানে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এ খাতকে শিল্পে রূপায়িত করে আগামী পাঁচ বছরে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বাজার ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
তারেক রহমানের এ মন্তব্যের যথার্থতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের চাহিদার বিষয়টি নতুন নয়। পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রফতানি করে তার একটি ক্ষুদ্র অংশই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ খাতে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয় তাহলে এর পরিমাণ তিন-চারগুণ বৃদ্ধি করা অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়।
শিক্ষা বিষয়ে তারেক রহমান তার ভাষণে যে প্রস্তাবনা রেখেছেন তাকে সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী বলেই আখ্যায়িত করা যায়। তিনি ইংরেজিসহ বহুভাষা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপের কথা বলেছেন। বলাই বাহুল্য যে, চাকরির বিশ্ববাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে হলে বিদেশি ভাষা রপ্ত করা ও তাতে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতরা যদি বিদেশি ভাষায় পরিদর্শী হয়ে উঠতে পারে, তাহলে বিশ্ববাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে আমাদের ছেলেরাও কাঙিক্ষত স্থান দখলে সক্ষম হবে।
পোশাক শিল্প খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বহির্বিশ্বে এর বাজার আরো সম্প্রসারণের কথা বলেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এ খাত যেহেতু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি আমাদের বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান করছে, তাই একে আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে অধিকতর গ্রহণীয় করে তুলতে হবে। যদি তা করা যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান ২২ বিলিয়ন ডলার থেকে এখাতে আয় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে। এজন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
তারেক রহমানের এ বিশ্লেষণ নিয়ে কারো কোনো সংশয় আছে বলে মনে হয় না। ক্রমবর্ধমান বিশ্ববাজার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের পোশাক শিল্পের উন্নয়নে অধিকতর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকি জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে আলাদা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তা-ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়।
তারেক রহমান তার ওই ভাষণে আরো যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন সেগুলো হচ্ছে- পরিকল্পিত আবাসন, কনস্ট্রাকশন, অটোমোবাইল, পর্যটন শিল্প, সমুদ্রের বালু থেকে সিলিকন আহরণ, আরো সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন, নদী-খাল-বিল খননের মাধ্যমে পানির চাহিদা পূরণ ইত্যাদি। তার পুরো ভাষণটি পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা অর্জনের জন্য যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন, তিনি তার একটি সেক্টরকেও বাদ দেননি। ঠিক যেমন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের গাইড লাইন দিয়ে গেছেন, তারেক রহমানও তার প্রস্তাবনায় সে ধরনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এটাকে শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির আধুনিক ও যুগোপযোগী সংস্করণ বললে বোধকরি অত্যুক্তি হবে না।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে তাঁর ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন ও ঘোষণা করেছিলেন। তারপর তিন যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। এই তিন যুগে বিশ্ব এগিয়েছে অনেক। আর সে জন্যই শহীদ জিয়ার ১৯ দফাকে বাস্তবায়িত করতে হলে আধুনিক চিন্তা-ভাবনাপ্রসূত পরিকল্পনা তার সঙ্গে সংযোজন করতে হবে। সে হিসেবে পিতার কর্মসূচির সঙ্গে পুত্রের মেধাবী চিন্তা-ভাবনার অপূর্ব সংযোজন হিসেবে তারেক রহমানের এ ভাষণকে আখ্যায়িত করা যায়।
এদেশের মানুষ সব সময় সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। আর সে স্বপ্নের মধ্যেই পরিবর্তনের সুবাতাস ছড়ালেন প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমান।
গতানুগতিক রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে নতুন এক সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। আর সেজন্যই তিনি বলেছেন, আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর। এ অগ্রযাত্রার গতি হতে হবে দ্রুত। লক্ষ্য হতে হবে সুনির্দিষ্ট। অতীতমুখী নয়, আমাদের চেতনা ও দায়বদ্ধতা হতে হবে ভবিষ্যতের। গতানুগতিক ধারার রাষ্ট্র পরিচালনায় আবদ্ধ থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ কিন্তু খুব উজ্জ্বল নয়।
লন্ডন ভাষণে তারেক রহমান দেশের রাজনীতির গতিধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন ও তার উন্নয়ন ভাবনার যে মডেল উপস্থাপন করেছেন, সঙ্গত কারণেই তা দেশবাসীকে আশান্বিত করে তুলবে।
একজন রাজনীতিক বা রাষ্ট্র্ননায়কের প্রজ্ঞার বিষয়টি ফুটে ওঠে তার বক্তৃতা-ভাষণ আর চিন্তা-ভাবনায়। বর্তমানে প্রতিপক্ষের দিকে সমালোচনা নিন্দা আর কটূক্তির তীর নিক্ষেপের মধ্যে আমাদের দেশের কোনো কোনো রাজনীতিকের চিন্তা-চেতনা ঘুরপাক খেতে দেখা যাচ্ছে। তাদের চিন্তা-ভাবনা কেবলই দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক। জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় উন্নয়ন তাদের কাছে একেবারেই গৌণ।
কিন্তু তারেক রহমান তার উল্লিখিত ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিকের পরিচয় দিয়েছেন। রাজনীতি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে নয়। তা জনকল্যাণেরও অন্যতম প্রধান বাহক- তারেক রহমানের ভাষণে সে ঐতিহাসিক সত্যই প্রতিফলিত হয়েছে। আর সেজন্যই তার ওই ভাষণ দেশবাসীর মধ্যে গভীর আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। বলাটা অতিশয়োক্তি হবে না যে, লন্ডনে প্রদত্ত ওই ভাষণ তারেক রহমানকে বাংলাদেশের জনগণের কাছে আরো বেশি গ্রহণীয় করে তুলবে। কারণ, জনগণ এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নেতৃত্বকে সর্বদা স্বাগত ও সমর্থন জানিয়ে থাকে।
Copyright © 2012- 2013 BNP
Leave your comment